হেলেন কেলার – অন্ধের চোখ, বেঁচে থাকার প্রেরণা।

হেলেন কেলার  (১৮৮০-১৯৬৮)

তাঁর পৃথিবী ছিল শব্দহীন, আলোহীন। তাই বুঝি তাঁর আত্মার নিরন্তর নিঃশব্দ ক্রন্দন ছিল : ‘আলো! আমাকে একটু আলো দাও, ঈশ্বর!’

যাঁর কথা বলছি তিনি হেলেন কেলার যাঁকে দেখে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন: :’I believe Miss Helen Keller is the purest minded human being ever in existence.’ এ কবির অত্যুক্তি নয়।

এই মুক-বধির অন্ধ মার্কিন মহিলাটির মধ্যে কবি নিশ্চয়ই এমন কিছু অসাধারনত্ব দেখতে পেয়েছিলেন যে জন্য হেলেন কেলারের চরিত্র মহিমা তিনি এইভাবে প্রকাশ করেছিলেন।

ঘৃণা-বিদ্বেষ-অশান্তি পূর্ণ আমাদের এই পৃথিবীতে মাঝে মাঝে আমরা এমন দুই একটি মানবিক গুণসম্পন্না মহীয়ষী নারীর সাক্ষাৎ পাই যাঁরা না এলে এই সমাজ সংসার অর্থহীন হতো।

ইউরোপে কুমারী ফেলারেন্স নাইটিংঙ্গেল আর আমেরিকার অ্যাডামন হেলেন কেলার—এই দুজনের নাম পৃথিবী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে চিরকাল।

প্রতিকূল ভাগ্য হেলেন কেলারের জীবনকে শৈশবেই নানাভাবে ব্যর্থ করে দিয়েছিল। কিন্তু তার বিরুদ্ধে অসীম সাহসের সঙ্গে সংগ্রাম করে হেলেন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিশ্বের সমকালীন নারী সমাজে এইখানেই ছিল তাঁর স্বাতন্ত্র্য।

বিচিত্র তাঁর জীবন কথা। তিনি নিজেই তাঁর অনেকখানি লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর আত্মচরিতে—‘The Story of my Life’ এর মধ্যে পাই তাঁর জীবনের প্রথম তেইশ বছরের কাহিনি।

তাঁর জীবনের পটভূমিকায় আছেন য়্যানি সুলিভান— যাঁর সমস্ত শিক্ষার ফলে শব্দহীন অন্ধকার জগৎ থেকে হেলেন মুক্ত হতে পেরেছিলেন।

য়্যানি সুলিভান ছিলেন তাঁর শিক্ষয়িত্রী—হেলেনের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রােত ভাবেই মিশে আছে তাঁরাে জীবন। আত্মজীবনীতে হেলেন লিখেছেন:

১৮৮০ সালের ২৭ জুন উত্তর আমেরিকায় টুমকুমরিয়া নামে ছােট্ট একটি শহরে আমি জন্মেছিলাম। আমার জীবনের আরম্ভ। আর পাঁচজন শিশুর মতােনই হয়েছিল।

পিতামাতার প্রথম সন্তান হিসাবে আমি একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশু হয়েই এই পৃথিবীতে এসেছিলাম। আমি এলাম, দেখলাম ও সকলের চিত্ত জয় করলাম যেমন আর পাঁচটি নবজাতক করে থাকে।

জন্মের পর এক বছর সাত মাস কাল পর্যন্ত আমি এই পৃথিবীকে দেখেছি, এর শব্দ শুনেছি আর মুখরিত করেছি অর্ধস্ফুট কলকল ভাবে আমাদের সংসার, আমার মায়ের মুখে শুনেছি আমি নাকি এক বছর বয়সেই হাঁটতে শিখেছিলাম।

: তাঁর জীবনের দুর্দৈব কিভাবে এসেছিল সেই কথা বর্ণনা করতে গিয়ে কুমারী কেলার লিখেছেন : আমার বয়স তখন সবে এক বছর সাত মাস পূর্ণ হয়েছে।

মায়ের মুখেই শুনেছি, এই সময়ে একদিন সকালে স্নানের ঘর থেকে আমাকে কোলে করে মা যখন বেরিয়ে আসছিলেন, তখন কাচের মতন স্বচ্ছ মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রভাত সূর্যের আলাে, সেই আলােতে প্রতিফলিত হয়েছিল বাগানের গাছের পাতাগুলির কম্পমান ছায়া।

তাই ধরবার জন্য আমি আচমকা ঝাপ দিয়েছিলাম মায়ের কোল থেকে মেঝের ওপর।

ছুটে ধরতে গিয়েছিলাম পাতাগুলি—কিন্তু সেগুলি যে পাতা নয়, ছায়া তা বুঝিনি, উত্তেজনাপূর্ণ সেই মুহূর্তটি মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি কেঁদে উঠেছিলাম মায়ের কোলে উঠবার জন্য।

শৈশবের এই সুখের দিনগুলি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি আমার জীবনে।

অতঃপর কী ঘটেছিল? সেই চিত্তস্পর্শী কথা তাঁর আত্মজীবনীতে হেলেন কেলার লিখেছেন এইভাবে :

তারপর ফেব্রুয়ারি মাসের রুক্ষ্মতা দেখা দেবার সঙ্গে সঙ্গে এলাে সেই কালব্যধি যার ফলে আমি হারালাম দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ শক্তি ও কথা বলার শক্তি।

আমার অবস্থাটা তখন দাঁড়ালাে ঠিক একটি নবজাত শিশুর মতােন। চিকিৎসকরা এলেন, তাঁরা পরীক্ষা করলেন এবং বললেন পাকস্থলী ও মস্তিষ্কের ক্রিয়া বিশেষভাবে ব্যাহত হওয়ার ফলেই ঘটেছে এই বিপর্যয়।

তাঁদের ধারণা হলো আমি হয়তাে বাঁচব না। মায়ের কোল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বার সময় যে প্রবল জুর এসেছিল, একদিন প্রত্যুষে দেখা গেল যে সেই জ্বর—যা রহস্যজনকভাবে হঠাৎ আক্রমণ করেছিল—আর নেই।

সেদিন আমাদের বাড়িতে কি আনন্দ। কিন্তু কেউ চিকিৎসকগণ পর্যন্ত বুঝতে পারেননি, আমি জীবনে আর দেখতে পারব না, শুনতে পারব না, কথা বলতে পারব না।

– হেলেন কেলারের জীবন থেকে তাঁর শিক্ষয়িত্রী য়্যানি ম্যানসফিল্ড সুলিভানের জীবনকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। ভাগ্যহত বালিকার জীবনের প্রভাত বেলায় এই মহিলাটি যেন সূর্যের আলাের মতােন তাঁর কাছে এসেছিলেন।

ক্রমশ জ্বর নিরাময় হলাে এবং তখন যে নৈঃশব্দ আর অন্ধকার হেলেনের পরিবেশকে ঘিরে থাকত, বালিকা তাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।

রবিন পাখির গানে মুখরিত একটি ক্ষণস্থায়ী বসন্ত ফলে ও ফুলে সুন্দর একটি গ্রীষ্ম আর সােনার রঙে উদ্ভাসিত একটি শরৎ—এরই ক্ষীণ স্মৃতি সেই অন্ধ, মূক ও বধির সেই বালিকাকে আনন্দ দিত।

জীবনের প্রথম উনিশটা মাসে দুই চোখ ভরে সে যা দেখেছে, সেই সবুজ মাঠ, আলােভরা আকাশ, গাছ, ফুল তার একটাও কিন্তু বালিকার স্মৃতি থেকে মুছে যায় না।

এই সময়ে তার মায়ের নিবিড় যত্নের মধ্যে হেলেনের দিনগুলি কিভাবে অতিবাহিত হতাে তার মর্মস্পর্শী বর্ণনা আছে ‘মাই লাইফ’, গ্রন্থে।

দেখতে দেখতে হেলেনের বয়স পাঁচ বছর হলাে। অন্ধ-স্বল্প জ্ঞান-বুদ্ধি হয়েছে। বুঝতে পারেন নিজের অসহায় অবস্থা বুঝতে পারেন সংসারের আর পাঁচটি মেয়ে থেকে তিনি পৃথক।

বছরের পর বছর যায়—বালিকার জীবনে নিঃশব্দ, লক্ষ্যহীন, দিবাহীন জীবন যেন ক্রমে দুর্বিসহ হয়ে উঠতে থাকে আর সেই সঙ্গে নিজেকে প্রকাশ করবার আকাঙ্খ যেন তাঁর অন্তরে দুর্নিবার হয়ে ওঠে।

একমাত্র কন্যার মিসেস কেলারের একটি পুত্র সন্তান পরে জন্মগ্রহণ করেছিল এবং সেটি অকালে মারা যায়) দুর্ভাগ্য বিড়ম্বিত জীবন পিতামাতাকে সর্বক্ষণ উৎকণ্ঠিত রাখত, তাঁর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাঁদের দুঃখের যেন সীমা-পরিসীমা ছিল না।

অবশেষে তাঁরা বালটিমােরে একজন বিখ্যাত হস্তবিদ্যা বিশারদের কাছে মেয়েকে নিয়ে গেলেন। তিনি অথচ কিছু করতে পারলেন না।

হেলেনের বাবাকে তিনি এই পরামর্শ দিয়েছিলেন : একে লেখাপড়া শেখান, ওয়াশিংটনের ডাক্তার আলেকজান্ডার গ্ৰেহাম বেলও ক্যাপ্টেন কেলারকে ঠিক ঐ কথাই বলেছিলেন।

ডাক্তার বেলের কাছে থেকেই তিনি বােস্টনের পার্কিনস ইনস্টিটিউসনের খবরটা পেয়েছিলেন। অন্ধদের জ্য এই প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করেছিলেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ডাক্তার হাে।

এইখান থেকেই ক্যাপ্টেন কেলার তাঁর মেয়ের জন্য সংগ্রহ করেছিলেন মিস য়্যানি ম্যানসফিল্ড সুলিভান নামনী এক বিদুষী শিক্ষয়িত্রী। ইনিই ভাগ্য-বিড়ম্বিতা বালিকার জীবনে এসেছিলেন কল্যাণময়ীরূপে।

হেলেনের বয়স সাত বছর পূর্ণ হতে তখনাে সাত মাস বাকি ছিল যখন ১৮৮৭ সালের মার্চ মাসে একদিন মিস সুলিভান দূরবর্তী আটলান্টা শহরে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন।

তাঁর জীবনের এই সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য ঘটনাটির কথা হেলেন কেলারের আত্মজীবনীতে এইভাবে বর্ণিত হয়েছে : তারিখটি ছিল ১৮৮৭ সালের মার্চ মাসের তিন তারিখ, সেদিন অপরাহ্ন বেলায় আমি বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম, মায়ের ব্যস্ত সমস্ত ভাব দেখে আবছা অনুমান করলাম তিনি যেন কার আসার প্রতীক্ষা করছেন।

আমি যেন শুনতে পেলাম কার পদক্ষেপের শব্দ। মা আসছেন মনে করে আনন্দে প্রসারিত করে দিলাম দুই হাত; কিন্তু আমার হাত দুটি সস্নেহে যিনি ধারণ করলেন তিনিই যে আমার শিক্ষয়িত্রী মিস সুলিভান, সেটা কিছুক্ষণ বাদেই বুঝেছিলাম।

এঁরই শিক্ষার গুণে আমার জীবনে অসম্ভব সম্ভব হয়েছিল—হঠাৎ ঘটেছিল আত্মার জাগরণ। –

মায়ের নিবিড় স্নেহ যেমন বালিকার জীবনকে ঘিরে থাকতাে, তখন থেকে মিস সুলিভানের স্নেহের আশ্রয়ে হেলেনের জীবন গড়ে উঠতে থাকে। তারই সযত্ন শিক্ষার গুণে ষােল বছর বয়সে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন একটি বালিকা বিদ্যালয়ে।

প্রতিদিন ছাত্রীর সঙ্গে সুলিভান স্কুলে যেতেন, ছাত্রীকে পাশে নিয়ে ক্লাসে গিয়ে বসতেন। ক্লাসে যা পড়ানাে হতাে তিনি শুনতেন নিবিষ্ট চিত্তে, তারপর ছাত্রীর হাতে নিজের আঙ্গুল দিয়ে তা লিখে দিতেন।

এই কাজ যে কি ক্লান্তিজনক ছিল তা সহজে ধারণা করা যাবে না। অসীম ধৈর্যের সঙ্গে দিনের পর দিন মাসের পর মাস তিনি এইভাবে পরিশ্রম করেছিলেন হেলেনের জন্য।

তাঁর এই পরিশ্রম সার্থক হয়েছিল। ১৯৩০ সালে হেলেন সসম্মানে স্নাতক হলেন। এখানে উল্লেখ্য যে হেলেনের স্কুল ও কলেজের শিক্ষা ইংলিশ ব্রেইল প্রথায় সম্পন্ন হয়েছিল।

অন্ধদের লেখাপড়া শেখাবার জন্য এইটিই হলাে শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। তিনি যখন স্নাতক হলেন তখন ইংরেজি ভিন্ন লাতিন, গ্রীক, ফরাসি ও জার্মানি—এই চারটি ভাষা সুন্দরভাবেই আয়ত্ত করেছিলেন।

দীর্ঘাঙ্গী, সুগঠিত দেহ ও সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারিণী হেলেন কেলার শিক্ষান্তে, যখন কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন তখন তাঁকে দেখা গিয়েছে একজন একনিষ্ঠ সমাজ সেবিকার ভূমিকায়।

চক্ষু দিয়ে তিনি দেখতে পেতেন না সত্য, কিন্তু তাঁর মনের দর্পণে তাঁর চারপাশের যাবতীয় ঘটনা ও বস্তু নিখুঁত ভাবেই প্রতিফলিত হতাে। মনের দৃষ্টি দিয়ে তিনি সবকিছু দেখতে ও বুঝতে পারতেন।

অনুভূতি ছিল তাঁর তীক্ষ্ণ, ধারণা শক্তি অসাধারণ এরই সাহায্যে তাঁর চারপাশের চলমান জীবন ধারাকে তিনি স্পর্শ করতে পারতেন গভীরভাবেই।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি ফিরে না পেলেও, উত্তরকালে । মিস কেলার এক বিশেষ পদ্ধতির চিকিৎসার ফলে বাশক্তি ফিরে পেয়েছিলেন।

বাইবেলের উপদেশ মিস কেলারের জীবনে, তাঁর বহুবিধ কর্ম প্রচেষ্টার মধ্যে রূপায়িত হয়েছিল।

পৃথিবীর অন্ধদের জন্য তিনি একাধিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন এবং দেশে দেশান্তরে বক্তৃতা দিয়ে যে টাকা পেতেন তাই দিয়ে এইসব প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ভার নির্বাহ হতাে, হেলেন কেলার সারা পৃথিবীতে কমবেশি অন্ধদের জন্য পঞ্চাশটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন এবং হাজার হাজার নরনারী এই সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষিত হয়ে সমাজকল্যাণ কাজে তাদের জীবন সার্থক করেছে।

১৯৫৫ সালটি মিস কেলারের জীবনে স্মরণীয় হয়ে আছে। ঐ বছরের ১৬ এপ্রিল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন সভায় তাঁকে সম্মানিত স্নাতক উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন হেলেনের চক্ষে পরম শ্রদ্ধার পাত্র। আমেরিকায় গিয়ে কবি তাঁর সঙ্গে আলাপ করে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁকে একবার শান্তিনিকেতনে আসবার জন্য নিমন্ত্রণ করেছিলেন, তিনি সেই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন।

একবার ভারত ভ্রমণের সময়ে তিনি শান্তিনিকেতন পরিদর্শন করেন।

রবীন্দ্রনাথ এমন দৃষ্টি দিয়ে আর কেউ কখনাে দেখেছেন কিনা সন্দেহ। হেলেন কেলার ঠিক তাই ছিলেন।

সারা পৃথিবীতে অন্ধদের কাছে তিনি প্রেরণা ও প্রেমের একটি প্রতীক হিসাবে পূজিতা হয়েছেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে নারীকূলে এই রকম দৃষ্টান্ত বিরল বললেই হয়।

আরও পড়ুন –

রাজা রামমােহন রায় – আধুনিক ভারতের অন্যতম কারিগর, বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক। Ram Mohan Roy

মাদার টেরেসা | বিশ্বজননী |সেবার প্রতীক | Mother Teresa

1 thought on “হেলেন কেলার – অন্ধের চোখ, বেঁচে থাকার প্রেরণা।”

Leave a Comment