রাহুল সংকৃত্যায়ন – বহুভাষাবিদ, পঙ্গু ও ভন্ড সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক অনন্য লেখক। Rahul Sankrityan

রাহুল সংকৃত্যায়ন

১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দের ৯ই এপ্রিল উত্তরপ্রদেশের আজমগড় জেলায় এক ব্রাহ্মণ পরিবারে রাহুলের জন্ম। বাবা গােবর্ধন পাণ্ডে ও মা কুলবন্তী। মাদ্রাসায় রাহুলের উর্দু শিক্ষা। বালক বয়সেই তাকে বিয়ে দেওয়া হয়।

মাত্র নয় বছর বয়সে যাযাবর স্বভাবের রাহুল ঘর ছেড়ে পালালেন। উপস্থিত হলেন কাশীতে এক সাধুর আখড়ায়। কিছুদিন সেখানে থেকে আবার ফিরে এলেন ঘরে।

চোদ্দ বছর বয়সে আবার ঘর ছাড়লেন। ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়লেন কলকাতায়। কোথাও আর থিতু হতে না পেরে আবার ফিরে গেলেন গ্রামে। তবে কলকাতা তাঁকে টানতে থাকে।

ফলে যােলাে বছর বয়সে আবার পাড়ি জমিয়ে এলেন কলকাতায়। এবার এক পান-বিড়ি- খৈনির দোকানের কর্মচারী। নিজে খৈনি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর ভিড়ে গেলেন একদল সাধুর সঙ্গে।

গাঁজা, সিদ্ধি, ভাঙ ইত্যাদির স্বাদ নিলেন। দেখলেন বেশিরভাগই নামে সাধু। আদতে সব ভণ্ড। তবে সাধুদের সঙ্গে থাকায় তার তীর্থ ও হিমালয় দর্শন সম্পূর্ণ হয়।

সতেরাে বছর বয়সে ঘুরতে ঘুরতে এলেন বেনারসে। নিজের অসাধারণ মেধাবলে এখানে তিনি সংস্কৃতভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। শাস্ত্রপাঠ সমাপ্ত হল।

তারপর ইংরেজি ও অঙ্কে দক্ষ হয়ে উঠলেন। একজন সাধুর আশ্রয়ে থেকে তাঁর এই বিদ্যাচর্চা। সেই সাধুর কাছেই দীক্ষা নিয়ে পুরােপুরি সন্ন্যাসীর জীবনধারা গ্রহণ করেন। তখন তার নতুন নাম হয় রামউদার দাস।

দক্ষিণ ভারতে কিছুদিন ছিলেন এবং সেখানে রপ্ত করে নেন তামিল ভাষা। তার স্মৃতি ও জ্ঞানার্জনস্পৃহা এত তীব্র ছিল যে কোনও কঠিন বিষয়ই নিজের আয়ত্তে আনতে বেশি সময় নিতেন না।

পরবর্তী পর্যায়ে তিনি দয়ানন্দ সরস্বতীর আর্য সমাজের সঙ্গে পরিচিত হন। বেশিরভাগ জায়গাতেই দেখলেন, ধর্মের নামে ভণ্ডামি ও মানুষকে প্রতারিত করা।

তিনি এ সবের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করে দেওয়ায় পুরােহিত ও পাণ্ডারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা রাহুলকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিল।

অকুতােভয় রাহুল তখন তার লেখনীর মাধ্যমে এই সমস্ত অনাচারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘােষণা করলেন।

১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি একবার বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। তার স্ত্রী তখন তরুণী। কিন্তু ঘর তাঁকে বেঁধে রাখতে পারেনি। আবার গৃহত্যাগী হলেন। পর্যটন ও পড়াশােনা—এই দুই নিয়ে তার দিনাতিপাত।

ইতিহাস, দর্শন, ভূগােল, সাহিত্য, ধর্মশাস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে তার অধিকার হয়ে উঠল সার্বিক ও গভীর। তিনি যেন এক চলমান জ্ঞানভাণ্ডার।

হিন্দুধর্মের অনাচার ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তিনি নিয়মিত লিখতে থাকেন মুসাফির’ এবং ‘ভাস্কর’ নামে প্রকাশিত দুটি উর্দু পত্রিকায়।

ইতিমধ্যে বুদ্ধদেবের জন্মস্থান লুম্বিনী তিনি ভ্রমণ করেছেন। গৌতম বুদ্ধের জীবন ও শিক্ষা তাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে।

১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড ও ১৯২১ খ্রীষ্টাব্দে গান্ধীজির সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ডাক রাহুলকে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নিয়ে আসে।

তিনি জাতীয় কংগ্রেসের বিভিন্ন মঞ্চে উঠে ইংরেজ বিরােধী ভাষণ দেন। অনেক সমাজসেবামূলক কাজে নিজেকে যুক্ত করেন। এইভাবে তার খ্যাতি বিস্তারিত হয়।

৩১শে জানুয়ারি, ১৯২২ ব্রিটিশ সরকার রাহুল সংকৃত্যায়নকে কয়েদ করে। বিচারে তার ছয় মাসের কারাদণ্ড হয়।

কারাবাসকালে তিনি ব্রজবুলি ভাষায় কতগুলি কবিতা লেখেন। তার চেয়েও বড়াে কাজ হল, সংস্কৃত ভাষায় কোরানের অনুবাদ।

জেল থেকেই তিনি গােপনে লেখা পাঠাতেন এবং তা ছাপা হত মাজহারুল সম্পাদিত ‘মাদারল্যান্ড’ পত্রিকায়।

তিনি রুশ বিপ্লব ও সাম্যবাদের প্রতিও আকৃষ্ট হন। জল থেকে মুক্তি পেয়ে গেলেন নেপালে। নেপাল থেকে ফিরে আসবাব পর আবার তিনি গ্রেপ্তার হন।

বাঁকিপুরের জেলখানায় অবস্থানকালে রাহুল চারটি ইংরেজি উপন্যাসের হিন্দি অনুবাদ করেন। হাজারিবাগ জেলে তাকে পাঠান হলে তিনি সেখানে বসে চর্চা করেন ফরাসি ও আবেস্তা ভাষা।

তার জ্ঞান ভাণ্ডার হয়ে উঠল অসীম। তার কলমও তার প্রচণ্ড ক্ষুরধার।

দীর্ঘ হাজতবাসের পর বেরিয়ে এসে রাহুল সংকৃত্যায়ন দেখলেন, তার প্রিয় রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের দুর্দশা। নরমপন্থী, চরমপন্থী ও মধ্যপন্থী—এই তিনভাগে বিভক্ত হয়ে নেতারা কাজিয়া করছেন নিজেদের মধ্যে।

বিরক্ত ও বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে সংশয় ত্যাগ করলেন।

১৯২৭ খ্রীষ্টাব্দে বৌদ্ধদেবের মহাবােধি সােসাইটি রাহুলকে শ্রীলঙ্কায় প্রেরণ করে বৌদ্ধধর্ম ও শাস্ত্র সম্পর্কে আরও জ্ঞানলাভের জন্য।

শ্রীলঙ্কায় অবস্থান কালে রাহুল সিদ্ধান্ত নেন, তিনি নিষিদ্ধ দেশ তিব্বতে যাবেন লামাদের তত্ত্বাবধানে রক্ষিত বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন পুঁথি উদ্ধার করতে।

সে সময়ে তিব্বতে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। প্রথমত, ইংরেজ সরকার কোনও ভারতীয়র তিব্বতযাত্রা নিষিদ্ধ করে রেখেছিল। দ্বিতীয়ত, তিব্বতে যাবার পথও ছিল অত্যন্ত দুর্গম ও বিপদসঙ্কুল। >

রাহুল কোনও বিপত্তিকেই আমল দিলেন না। তিনি ছদ্মবেশে একদল তিব্বতী ব্যবসায়ীর দলে গিয়ে ভিড়লেন। নিজেকে পরিচিত করলেন একজন লামা হিসেবে।

পরে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা স্থাপিত হয়। তারা দু’জনে অশেষ পরিশ্রম করে ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চড়াই উৎরাই ভাঙতে ভাঙতে শেষাবধি উপস্থিত হলেন নারথাং বৌদ্ধগুম্ফায়।

নারথাং গুম্ফায় তিনি বিস্তর প্রাচীন পুঁথির সন্ধান পেলেন।

তারপর গেলেন লাসায়। নিজেকে দালাইলামার শিষ্য বলে জানিয়ে আরও অনেক প্রাচীন পুঁথির মুখােমুখি হলেন। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রভুত অর্থ ও সম্পদ।

সেই অর্থের বিনিময়ে তিনি তিব্বতীদের কাছ থেকে কিনে নিলেন বহু দুলর্ভ পুঁথি, চিত্র, পট ইত্যাদি। তার সেই সংগ্রহকে বহন করবার জন্য ভাড়া করতে হয়ছিল আঠারােটি টাটুঘােড়া।

সেই বিপুল পুরাসম্পদ নিয়ে মাসাধিককাল পথ পাড়ি দিয়ে রাহুল সংকৃত্যায়ন কালিম্পং-এ উপস্থিত হলেন ২৪শে এপ্রিল ১৯৩০ খৃষ্টাব্দে।

তিনি তার এই বিপুল সমৃদ্ধ সঞ্চয়ভাণ্ডারকে উপহার দিয়ে যান পাটনা মিউজিয়ামকে। আসমুদ্র হিমালয় ভারতবর্ষ সেদিন স্তম্ভিত ও শ্রদ্ধায় নত হয়েছিল এই অনন্য পণ্ডিত ও সাহসী ব্যক্তিটির প্রতি।

। রাহুল ইউরােপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করেন। তিনি যেখানেই গেছেন, মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন তার ব্যবহার ও পাণ্ডিত্যের দ্বারা। তিনি রাশিয়াতে দু’বার পদাপর্ণ করেন।

রাশিয়ায় অবস্থানকালে রুশ যুবতী লােলার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরিচয় ঘনিষ্ঠতার রূপ নেয়। তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রাহুল ও লাের একটি পুত্রসন্তানও জন্মায়। তার নাম ইগর।

কিন্তু সরকারি নিষেধ থাকায় রাহুল তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ও পুত্রকে ভারতবর্ষে নিয়ে আসতে পারেন নি।

১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দে তিনি রাশিয়ার লেনিনগ্রাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। অধ্যাপকরূপেও তিনি ছিলেন সফল।

১৯৪৮ খ্রীষ্টাব্দে স্বাধীন ভারতে ফিরে আসেন রাহুল সংকৃত্যায়ন। এখানে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন কমলা পেরিয়ার নাম্নী এক শিক্ষিতা নেপালী মহিলা— যাঁকে রাহুল বিয়েও করেছিলেন।

কিন্তু শরীর আর ভার বহনে সক্ষম ছিল না। তার হয়েছিল দুরারােগ্য অ্যামনেসিয়া ব্যাধি—যা তাঁর স্মৃতি ও বােধকে নষ্ট করে দেয়।

চিকিৎসার জন্য তাঁকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হলেও তার রােগমুক্তি ঘটেনি। ১৯৬৩ খৃষ্টাব্দের ১৪ই এপ্রিল দার্জিলিং-এ তাঁর বিচিত্র পরিব্রাজক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

রাহুল সংকৃত্যায়ন নিরলসভাবে সাহিত্যচর্চাও করে গেছেন সারা জীবন ধরে। উপন্যাস, ভ্রমণবৃত্তান্ত, গল্প, ধর্ম, জ্যোতিষ, ইতিহাস, রাজনীতি, অনুবাদ— সর্বত্রই তিনি অতুলনীয়।

তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা একশ পঁচিশ। ভারতীয় সাহিত্যে তিনি এক আমার স্রষ্টা।

আরও পড়ুন –

রাজা রামমােহন রায় – আধুনিক ভারতের অন্যতম কারিগর, বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক। Ram Mohan Roy

করুণাসাগর বিদ্যাসাগর – বাংলার গর্ব , দামোদরের রাজপুত্র, মেদিনীপুরের সন্তান।

1 thought on “রাহুল সংকৃত্যায়ন – বহুভাষাবিদ, পঙ্গু ও ভন্ড সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক অনন্য লেখক। Rahul Sankrityan”

Leave a Comment