শিবনাথ শাস্ত্রী – সাহিত্য জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, পুরোধা পুরুষ।

শিবনাথ শাস্ত্রী

বাঙালি প্রবন্ধক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন হাতে গোনা ক’জনের মধ্যে শিবনাথ শাস্ত্রী হলেন অন্যতম। তিনি পুরোধা পুরুষ হিসেবেও ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনে স্বীকৃত।

তাঁর লেখনী ছিল তলোয়ারের মতো তীক্ষ্ণ। তীব্র ভাষায় জেহাদ ঘোষণা করেছেন সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে।

১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে ৩১ জানুয়ারি তাঁর জন্ম হয়েছিল। শিবনাথের মামার বাড়ি ছিল দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার অন্তর্গত চাঙরিপোতা গ্রামে। সেই মামার বাড়িতে শিবনাথের জন্ম হয়।

তিনি তাঁর মাতামহী অর্থাৎ দিদিমাকে খুবই ভালোবাসতেন। তাঁর দিদিমার কাছেই শিবনাথ শাস্ত্রীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল।

তাঁর ছোটবেলার স্মৃতিকথা হিসেবে শিবনাথ তাঁর আত্মচরিতে লিখেছেন— আমার মাতামহীর ন্যায় ব্রাহ্মণ কন্যা বিরল।

বলিতে কি, তাহাকে আমি যখন স্মরণ করি, আমার হৃদয় পবিত্র উন্নত হয় এবং একথাও আমি মুক্ত কণ্ঠে বলতে পারি যে আমাতে যে কিছু ভালো আছে তার অনেক অংশ তাহাকে দেখিয়া পাইয়াছি।

শিরনাথের পিতার নাম হরচন্দ্র ভট্টাচার্য। মাতার নাম গোলকমণি। তাঁর পিতা ছিলেন গোঁড়া ব্রাহ্মণ। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করতেন ব্রাহ্মণত্বের সব কিছুই বজায় রাখার জন্য।

তা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সদাশ্রম পরোপকারী ছিলেন। শিবনাথের বাবার ভীষণ রাগ ছিল। দায়িত্বজ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন কোনো কারণে রেগে গেলে। আমরা জানতে পারি তার রাগ সম্পর্কে অনেক ঘটনা।

একটু বড়ো হয়ে গোঁড়া হিন্দু সমাজের শিবনাথ শাস্ত্রী ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করলেন। শিবনাথের ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করার সংবাদ পৌঁছাল হরানন্দের কাছে।

তাই এক কাপড়ে পুত্রকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেন হরানন্দ। হরানন্দ যে ছেলেকে প্রাণের থেকে বেশি ভালোবাসতেন, তার মুখও দর্শন করবেন না। হরানন্দ এই প্রতিজ্ঞা করলেন।

কখনো কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্ত আর পাল্টাতেন না হরানন্দ। এটাই তাঁর চরিত্রের সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল।

শুধু তাই নয়, শিবনাথ আর যাতে বাড়িতে ফিরতে না পারেন তার জন্য বাবা রেগে গিয়ে খরচ করে গুণ্ডা লাগালেন। তিনি ২৫ টাকার বেতনের মজিলপুর সরকারি স্কুলের একজন কর্মী ছিলেন।

অথচ তাঁর ২২ টাকা খরচা হয়ে গিয়েছিল গুণ্ডা লাগাবার জন্য। এটি ভাবতেও আমাদের অবাক লাগে। অত্যন্ত মাতৃভক্ত ছিলেন শিবনাথ। তিনি মায়ের সঙ্গে দেখা না করে থাকতে পারতেন না।

তাই মাঝে মাঝে পোষা গুণ্ডার চোখ এড়িয়ে মজিলপুর যেতেন। মজিলপুর যেতেন, মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসতেন।শিবনাথের বড় মামার নাম দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ। তিনি ছিলেন সে যুগেরএক সুনামধন্য ব্যক্তি। তিনি সম্পাদনা করতেন সোম প্রকাশ নামক পত্রিকার।

শিবনাথের সাহিত্য প্রতিভা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে। তাঁর বড় মামা দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের সংস্পর্শে এসে। তবে আমরা জানি শিবনাথ —এর ক্ষেত্রে প্রতিভা ছিল সহজাত।

প্রবন্ধকার হিসেবে শুধু পরিচিত ছিল না শিবনাথের। তাঁর উজ্জ্বল পদচিহ্ন আঁকা আছে সমাজের সকল ক্ষেত্রে। তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল জ্বলন্ত দেশপ্রেম।

তিনি ভালোবাসতেন সমস্ত মানুষকে ঈশ্বরের সাক্ষাৎ হিসেবে। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক ধর্ম প্রচার করতে যেখানে সামাজিক সাম্য হবে মূল ভিত্তি। শিবনাথের কর্মময় জীবন গড়ে উঠেছিল।

ঈশ্বরের বিশ্বাস এবং নিজের কর্তব্যের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে তাঁর কর্মময় জীবন গড়ে উঠেছিল। তার বক্তব্য ছিল যতটুকু জীবনে সময় পাওয়া যাবে, মানুষের সেবা করতে হবে।

ব্রাহ্ম সমাজকে কেন্দ্র করে তাঁর কর্ম ব্যয়িত হয়েছে। তাঁকে এক উচ্চোকোটি সাধকও বলে থাকেন অনেকে।

মজিলপুর গ্রামের পাঠশালায় এই শিবনাথের বিদ্যাশিক্ষা শুরু হয়েছিল। বিভিন্ন গ্রামে কতগুলো আদর্শ বাংলা স্কুল স্থাপিত হয়। এই স্কুল স্থাপিত হয় বাংলার গভর্নর লর্ড হাভিঞ্জের উদ্যোগে।

তেমন একটি আদর্শ স্কুল স্থাপিত হয় মজিলপুর গ্রামে। শিবনাথ পাঠশালা থেকে ঐ বাংলা স্কুলে পড়ার জন্য এলেন। মাত্র ৯ বছর বয়সে তাঁকে শিক্ষকতার কাজ করতে হয়েছিল।

শিবনাথ তখন মাস্টার মশাই হয়েছেন। কিন্তু তাঁর থেকে বয়সে অনেক বড়াে ছিল ছাত্রছাত্রীরা। তাঁর বাবার সম্পর্কিত এক কুলি বিধবা ছিলেন কয়েকজন ছাত্রী।

তিনি ৫গুণ বড় ছিলেন শিবনাথের থেকে বয়সে। মাস্টার মশাই এই ছাত্রীকেও পড়াতেন বর্ণপরিচয়। যখন শিবনাথ গ্রামের স্কুলে পড়াতেন তখন তিনি ভােরে উঠে নানা ধরনের দুষ্টুমিতে মেতে উঠতেন।

রাতের অন্ধকারে প্রতিবেশীদের বাগান থেকে ফল চুরি করতেন। আমের মরশুমে আম কুড়ােতেন। শিবনাথ এতােটাই ডানপিটে ছিলেন যে তাঁর সঙ্গে কেউ পেরে উঠতাে না।

আবার মাঝে মাঝে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতেন। আবার সেটি সকলের চোখ এড়িয়ে। আবার বিস্ময়ে প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকতেন।

ছােটবেলায় পাখি পুষতে ভালােবাসতেন। তাই দোয়েল, টুনটুনি, বুলবুলির বাসা খুঁজতেন। বাসা থেকে কচি পাখির ছানা আনতেন। এবং তা বাড়িতে রেখে দিতেন খাঁচায় বন্দি করে।

ফাঁদ পেতে টিয়া পাখি ধরতেন। নানা শব্দ শেখাবার চেষ্টা করতেন পােষা টিয়াকে। পােষ্যদের তালিকায় তিনি শুধু পাখি পুষতেন না পিপড়ে ও ফড়িং বাদ ছিল না।

তিনি ছােটোবেলা থেকে কঠোর পরিশ্রম করতেন। এবং প্রাণীদের পােষ মানিয়ে ছিলেন। তাঁর মস্তিষ্কে যে সুগভীর মানবপ্রেম ছিল, তারই যাত্রা হয়েছিলাে হয়তাে এইভাবে পশু প্রেম থেকে।

শিবনাথের পৈতে বা উপনয়ন হয় মাত্র ন বছর বয়সে। ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য বাবা হরানন্দ নিয়ে এলেন। কলকাতার সংস্কৃত কলেজে তাকে ভর্তি করে দেওয়া হয়।

বিশেষ যত্ন সহকারে সংস্কৃত কলেজে সেই সময় ইংরাজি শেখানাে হত। সংস্কৃত কলেজের বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাব্রতী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন সর্বেসর্বা অর্থাৎ অধ্যক্ষ।

সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ অর্থাৎ শিবনাথের বড়মামা।

শিবনাথকে পড়াশুনা শিখতে হয়েছিল কলকাতার মামারবাড়ি থেকে। বিভিন্ন দুঃখ-যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তার দিন কাটে। অনেকেরই নৈতিক চরিত্র ভালাে ছিল ।

তাদের মধ্যে অনেকে নানা কু-অভ্যাসে রপ্ত ছিল। বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারেনি এইসব ঘটনা, বালক অথবা সদ্য কিশাের শিবনাথকে।

মামার বাড়িতে একঘরে এক চিত্রকর থাকতেন। ছবি আঁকতেন তিনি। শিবনাথ স্কুল থেকে ফিরে সােজা সেই ঘরে চলে যেতেন। সেখানে নিমগ্ন হয়ে ছবি দেখতেন।

বড়মামা অন্য বাড়িতে উঠে যান কিছুদিনের মধ্যেই। বড়বাজারের বেদিয়া পাড়ায় চলে আসেন শিবনাথ তার বাবার সঙ্গে। যখন তিনি বেদিয়া পাড়ায় থাকতেন তখন তার এক সহপাঠীর উদ্দেশ্য করে একটি কবিতা লিখেছিলেন।

ইজার চাপকান গায়ে স্কুলে আসে যায় নাম তাঁর গঙ্গাধর হাতি বড়তার অহংকার ধরা দেয় সবাকার চলে যেন নবাবে নাতি—এটি ছিল কবিতার প্রথম চার লাইন।

পরবর্তী কালে এই কবিতা সম্পর্কে শিবনাথ মন্তব্য করেছেন—আমাদের ইংরাজি মাস্টার ছিলেন রাধাগােবিন্দ মৈত্র।

আমার হাত হইতে কবিতাটি লইয়া মনােযােগ পূর্বক পাঠ করেন এবং আমার মস্তকে হাত দিয়া বলিলেন, তােমার কবিতা বেশ হয়েছে, কিন্তু মানুষকে গালাগালি দিয়ে কবিতা লেখা ভালাে নয়।

আমার কবিতার জীবন থেকে উৎসুক কয়েকগুণ বেড়ে গেল এই কথা শুনে। অনেক কবি সাহিত্যিক প্রবন্ধকার পরবর্তীকালে তার সাথে ঘনিষ্ঠ যােগাযােগ স্থাপন করেন। এই ছােট কবিতার মধ্য দিয়ে এইভাবেই তাঁর জীবনের সূত্রপাত হয়েছিল।

প্রথা অনুসারে শীতকালে শিবনাথের বিয়ে হয়। শিশু বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ে হল শিবনাথের সঙ্গে প্রসন্নময়ীর। শিবনাথের বয়স ছিল তখন মাত্র ২ বছর। আর প্রসন্নময়ীর বয়স ছিল ১ মাস।

যখন বেদিয়া পাড়াতে থাকতেন তখন আবার তাদের অর্থাৎ শিবনাথ এবং প্রসন্নময়ীর আনুষ্ঠানিক বিবাহ সম্পন্ন হয়।

শিবনাথ এই বিবাহ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন— এই বিবাহকালীন সকল বিষয় আমার স্মরণ হয় এই মাত্র স্মরণ আছে যে, আমি কানে মাকড়ি, গলায় হার হাতে বাজু এবং বালা পরে বিবাহ করতে বসিয়াছিলাম।

খ্যাতিলাভ করেছিলেন শিবনাথ প্রবন্ধকার হিসেবে। তাঁর রচিত অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে আছে কর্মজীবন রামমােহন রায়, নয়নতারা, বিধবার ছেলে, হিমাদ্রি কুসুম নিলাদ্রের বিলাপ ইত্যাদি।

ইংরাজিতেও তিনি বেশ কয়েকটি বই লেখেন। যেমন- History of Brahma Samaj I have start ইত্যাদি।

ইংল্যান্ডে ন্যাশনাল জার্নালে নিয়মিত ভাবে প্রকাশিত হতে থাকে তার লেখা মেজবউ উপন্যাসের ইংরাজি অনুবাদ।

তিনি ১৮৯৫ সালে মুকুল পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেন। এখন আর এই পত্রিকা বেঁচে নেই। শিশু সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান কত গভীর ছিল তা আমরা বুঝতে পারি এই পত্রিকা হাতে এলে।

১৯১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তারিখে শিবনাথ শাস্ত্রী লােকান্তরিত হন।

আরও পড়ুন –

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – কবিগুরু ,নোবেলজয়ী, গীতাঞ্জলির রচয়িতা, বাঙালির গর্ব, জাতীয় সংগীতের রচয়িতা।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় | ভাষাতাত্ত্বিক এবং বহুভাষাবিদ | এনসাইক্লোপিডিস্ট | Suniti Kumar Chatterji

3 thoughts on “শিবনাথ শাস্ত্রী – সাহিত্য জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, পুরোধা পুরুষ।”

Leave a Comment