দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ – আইনবিশারদ, ব্যারিস্টার, দেশপ্রেমিক। Chittaranjan Das | Indian lawyer

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ

যে কটি নাম সােনার অক্ষরে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে লেখা আছে তাঁদের অন্যতম দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। তিনি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন। সুভাষ প্রত্যক্ষ রাজনীতির জগতে প্রবেশ করেছিলেন দেশবন্ধুর পরামর্শ এবং নির্দেশানুসারেই।

ব্যক্তিগত জীবন –

১৮৭০ সালের ৫ নভেম্বর চিত্তরঞ্জনের জন্ম হয়। তিনি কলকাতায় জন্মেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে তেলিরবাগে তাঁদের পৈত্রিক নিবাস ছিল।

চিত্তরঞ্জনের পিতার নাম ভুবনমােহন দাশ। তিনি ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের এক নামকরা অ্যাটর্নি। তিনি ধনী ছিলেন। তবুও তিনি সহজ সরল জীবন যাপন করতেন। তাঁর মতাে মনের মানুষ তখনকার দিনে খুব কম দেখা যেত। দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না। দু’হাতে দান ধ্যান করতেন। তিনি একজন আইনজ্ঞ ছিলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ পারদর্শীতা ছিল সঙ্গীতে, ভালাে বাসতেন গান গাইতে। সকলকে মুগ্ধ করতেন গান শুনিয়ে।

চিত্তরঞ্জন ছােটোবেলা থেকেই চোখের সামনে পিতাকে দেখেছিলেন। পিতার গুণগুলি তিনি রপ্ত করেছিলেন। তাঁকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছিল পিতার চরিত্র। তিনিও হয়ে ওঠেন একজন দানবীর। তাঁর সীমাহীন অনুরাগ ছিল শিল্প এবং সংস্কৃতির প্রতি।

এবার আমরা চিত্তরঞ্জনের মায়ের কথা বলি। তাঁর মায়ের নাম নিস্তারিণী দেবী। সার্থক ছিল তাঁর নাম। অনেক মানুষকে তিনি লুকিয়ে সাহায্য করতেন। কোনােদিন কোনাে প্রার্থী তাঁর কাছ থেকে খালি হাতে ফিরে যাননি। তখন শহরে এমন একটি প্রবাদ প্রচলিত ছিল।

চিত্তরঞ্জনের বাড়ির পরিবেশ খুবই সুন্দর ছিল। সেখানে বিরাজ করত শান্তি। তবুও মাঝে মধ্যে অশান্ত হয়ে উঠত চিত্তরঞ্জনের মন। ছােটোবেলা থেকেই স্বদেশ চিন্তার স্ফুরণ দেখা যায় তাঁর মনে। ভারতবাসীরা পরাধীন। ভারতমাতাকে আজ শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছে সাতসাগরের থেকে একদল সাহেব এসে। তিনি ছােটোবেলা থেকে এই ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি মাঝে মাঝে বলতেন-“আমি সর্বাঙ্গে লৌহ শৃঙ্খলের ঝঝ শুনছি। আমার সর্বাঙ্গে আমি বেদনা অনুভব করছি। আমাদের ভাঙতে হবে পরাধীনতার শৃঙ্খল। এতে আমার যদি মৃত্যু ঘটে তাতেই বা কি?

শিক্ষাজীবন –

লণ্ডন মিশনারী স্কুলে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের পড়াশােনা শুরু হয়। তখন শহর কলকাতায় যথেষ্ট নাম করেছিল এই বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ে পড়তে আসতেন বিত্তবান পরিবারের ছেলেরা। একটা সুন্দর বাতাবরণ বজায় ছিল এখানে পড়াশােনার। এই স্কুলে এসে চিত্তরঞ্জন বুঝতে পারলেন, জীবনে সফল হতে গেলে নিয়মনিষ্ঠ হতেই হবে। তাঁর মনে তখন থেকেই এক ধরনের দৃঢ়তার জন্ম হয়, জন্ম হয় তেজস্বীতার। সেই বালক বয়সেই তিনি অর্জন করেছিলেন নেতা হওয়ার সব কটি গুণ। তাই দেখা গেল চিত্তরঞ্জন স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মুখ্য ভূমিকা নিচ্ছেন। একবার এক গর্বিত লােকের কথার প্রতিবাদে তিনি বলেছিলেন কী বললেন? ছছাটোলােক? ছােটোলােক কি কারাে গায়ে লেখা থাকে? মানুষই হয় গরিব, মানুষই হয় ধনী।

তাঁর বয়স তখন দশ-এগারাে বছরের বেশি হবে না। সকলে অবাক হয়ে গিয়েছে বালকের মুখ থেকে এইসব কথা শুনে। বােঝা গিয়েছিল বয়স কম হলে কী হবে, একটি প্রাজ্ঞ এবং প্রাপ্তবয়স্ক চেতনা চিত্তরঞ্জনের মধ্যে রয়ে গেছে।

তিনি পড়াশােনাতে তুখােড় ছিলেন। সমস্ত বই পড়তে ভালােবাসতেন। তাঁর বই পড়ার প্রতি আগ্রহ ছিল। প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফল হলেন ১৮৮৬ সালে। প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেন। তাঁর মনােজগতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেল এখানে আসার পর। তাঁর যেসব ভাবনা ছিল উন্মেষ পর্বে, এবার তারা পরিপুষ্ট হয়ে উঠল ধীরে ধীরে। তিনি বি. এ. পাশ করলেন। তারপর তাঁকে তাঁর বাবা বিলেতে পাঠালেন আই. সি. এস. পড়ার জন্য। তাঁর প্রথম প্রথম খুবই অসুবিধা হত বিলেতে গিয়ে। বিদেশ বিভুই, একেবারে সভ্যতা ও সংস্কৃতি অন্যরকম। ধীরে ধীরে তিনি মানিয়ে নিলেন বিলেতের পরিমণ্ডলের সঙ্গে। নেতৃত্ব দিলেন প্রবাসী ভারতীয় ছাত্র আন্দোলনে। তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয়রা রুখে দাঁড়ান নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এর ফলে তিনি বিফল হলেন আই, সি, এস, পরীক্ষাতে। অনেকে বলে থাকেই ব্রিটিশরা ইচ্ছা করেই তাঁকে পাশ করাতে রাজি হননি। তারা বুঝতে পেরেছিল, একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ লুকিয়ে আছে চিত্তরঞ্জনের মধ্যে। তিনি যদি দেশে ফেরেন প্রশাসক হয়ে, তাহলে ইংরেজের সর্বনাশ।

কর্মজীবন –

অবশেষে দেশে ফিরে এলেন ব্যারিস্টার হয়ে। কলকাতা হাইকোর্টে যােগ দিলেন। ১৮৯৭ সালে চিত্তরঞ্জনের বিয়ে হয়। তিনি বাসন্তীদেবীকে বিয়ে করেছিলেন। পরবর্তীকালে বাসন্তীদেবী সর্বার্থে তাঁর যােগ্য সহধর্মিণী হয়ে উঠেছিলেন।

প্রথম দিকে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি ব্যারিস্টার হিসেবে। তাঁর প্রসার পরে ধীরে ধীরে জমতে থাকে। চিত্তরঞ্জন আইনবিশারদের পাশাপাশি কবিতা রচনা করতেন। তাঁর লেখা ‘অন্তর্যামী’, মালী, সাগরসঙ্গীত’ প্রভৃতি কাব্য এক সময় হয়ে উঠেছিল খুবই জনপ্রিয়। তাঁর কাব্য প্রতিভায় অনেকেই মুগ্ধ হন। তাঁরা ভাবতেই পারতেন না যে, আইন বিশারদ হওয়া সত্ত্বেও তিনি কবিতা লেখার মতাে সময় পেতেন কী ভাবে? অরবিন্দের মতাে তাঁর কাব্য পাঠে তৃপ্তি পেতেন, ক্রমে তিনি নিজেকে নিযুক্ত করলেন জনসেবার কাজে। ত্যাগ করলেন ভােগবিলাসের জীবন। দেশকে স্বাধীন না করা পর্যন্ত নিজের সুখ শান্তি কোনাে দিকে মন দেবেন না তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।

তাঁর নাম ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল আইন বিশারদ হিসেবে। তখন তাঁর মাসিক রােজগার ছাড়িয়ে গিয়েছিল ৫০ হাজার টাকা। ভাবতে অবাক লাগে তখনকার দিনে এত টাকা যে রােজগার করা যেতে পারে। প্রচুর আয় ও প্রতিপত্তি, যেন লক্ষ্মীর বরপুত্র। কিন্তু তাতেও তাঁর মন ভরেনি। তিনি 1 আইন ব্যাবসা ছেড়ে দিলেন এবং নাম লেখালেন সর্বহারা নামে। নিজের সব কিছু দান করলেন দেশের কাজে। তখন থেকেই তাঁর নাম হয় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন।

১৯০৮ সালে শুরু হল মানিকতলার মামলা। শ্রীঅরবিন্দ এই মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন। মামলার গতি প্রকৃতি যে দিকে এগােচ্ছে সকলেই ভাবলেন অরবিন্দকে এবার বােধ হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এগিয়ে এলেন চিত্তরঞ্জন। তিনি অবলম্বন করলেন অরবিন্দের পক্ষ। অরবিন্দকে শেষ পর্যন্ত রুদ্ধ কারা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হল তাঁর আইনজ্ঞান, প্রতিভা এবং বাকশক্তির বলে। চিত্তরঞ্জনের নাম ছড়িয়ে পড়ল সারা বাংলাদেশে। তাঁর বাগ্মীতার কথা পৌছে গেল ভারতবাসীর কাছেও। চিত্তরঞ্জন তা প্রমাণ করে দিলেন এমনভাবে যে সওয়াল করা যায়। তিনি এক হৃদয়বান মানুষ ছিলেন। ভালােবাসতেন মানুষকে দু’হাতে দান করতে।

১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ৪ সেপ্টেম্বর কংগ্রেসের সম্মেলনে। চিত্তরঞ্জনের জীবনে দিনটি মনে রাখার মতাে। নাগপুরের অধিবেশনে তিনি পা বাড়ালেন। তাঁর সঙ্গে দেখা হল মহাত্মাজীর। মহাত্মাজীর সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে তিনি বুঝতে পারলেন প্রধান দেশে সর্বাত্মক আন্দোলন করতে হবে। কলকাতার বাড়িতে ফিরে আসার পর মনে হল তিনি বুঝি একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেছেন। দেশ সেবায় মন্ত্র গ্রহণ করেছিলেন সবকিছু নিঃস্বার্থে উৎসর্গ করার। এক নতুন সেনাবাহিনী গড়ে উঠল তাঁর নেতৃত্বে। স্বরাজদল নামকরণ করা হল। এবার তাঁর জীবনে জয়ের পালা শুরু হল। তাঁকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় নেতা হিসাবে অভিষিক্ত করা হল। কলকাতা কর্পোরেশনের প্রথম মহানাগরিক বা মেয়র হলেন তিনি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন একদিন দেশের শাসনভার অর্জন করতে হবে এইভাবেই স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমেই। তিনি অনেকগুলি জনকল্যাণকর কাজ শুরু করেন কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে। শহর কলকাতায় যে নাগরিক পরিকাঠামাে এবং পরিষেবা আমরা দেখতে পাই, কখনাে ভুলতে পারব না তার অন্তরালে চিত্তরঞ্জনের অবদানের কথা।

শেষজীবন –

এর পাশাপাশি একাধিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেন কংগ্রেসের ডাকে। তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয় বেশ কয়েকবার। তিনি তা সত্ত্বেও ভেঙে পড়েননি। স্বাস্থ্য ভেঙে গেল অতিরিক্ত পরিশ্রমে। দার্জিলিং-এ গেলেন স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য। তারপর ঘনিয়ে এল বিদায়ের ক্ষণ। ১৯২৪ সালের ১৪ জুন চিত্তরঞ্জনের মৃত্যু হয়। বিষাদের ঘন অন্ধকার সারা দেশে নেমে আসে।

তাঁর পৈত্রিক বাড়িটি মৃত্যুর আগে তিনি দেশবাসীকে দান করে যান। এখন সেখানে চিত্তরঞ্জন সেবাসদন স্থাপিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ এই মহান নেতার প্রয়াণের পর লিখেছিলেনএনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান। বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল প্রশস্তি রচনা করলেন

দীনের বন্ধু, দেশের বন্ধু, মানব বন্ধু তুমি, চেয়ে দেখ আজ লুটায়ে বিশ্ব তােমার চরণ তুমি।

admin

I am Asis M Maiti. I am currently working in a private institution. After completion of my academic so far I am learning about many new concepts. Try to circulate these to the people nearby. To explore my thinking to worldwide I am in the world of blogging. Love to eat, travel, read.Love to explore various movies. You will not be bored here.Keep in touch.You are inspiration to me.